| সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 45 বার পঠিত

অর্থবিজ প্রতিবেদক :
বিদায় বছর ২০২৫ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ব্যবসা ও অর্থনীতির ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে। যেসব প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, বৈদ্যুতিক যান, চিপ উৎপাদন, বিলাসপণ্য এবং সুপার-স্কেল প্ল্যাটফর্ম বিশ্বের পরবর্তী দশকের অর্থনীতিকে সংজ্ঞায়িত করবে, সেই খাতই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। সেই প্রভাবের নিরিখে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দশজন ব্যবসায়ী নেতার তালিকা দেওয়া হলো, যেখানে শিল্পখাতের বৈচিত্র থাকলেও ক্ষমতার উৎস একটিই- বিশ্বব্যাপী কোটি মানুষের জীবন ও সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা।
প্রতিবেদনে প্রতিটি নেতার প্রভাব, শক্তি, ব্যবসায়িক দর্শন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
১. ইলন মাস্ক (টেসলা, স্পেসএক্স, এক্স):
ইলন মাস্ক ২০২৫ সালের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী নেতা, এর মূল কারণ তার বিনিয়োগের পরিধি এবং প্রভাবের ক্ষেত্র। তিনি যে তিনটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন—টেসলা, স্পেসএক্স এবং এক্স প্রতিটি নিজ নিজ খাতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।
পরিবহন বিপ্লব: টেসলা বৈদ্যুতিক যান বাজারে এখনও সবচেয়ে বড় নাম। বৈদ্যুতিক যান নির্মাণ, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও স্বয়ংচালিত প্রযুক্তির সমন্বয়ে পৃথিবীর পরিবহননীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের পরিবেশনীতি, শুল্কনীতি এমনকি খনিজ অনুসন্ধানেও টেসলার প্রভাব দেখা যায়।
মহাকাশ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ: স্পেসএক্স বিশ্বের একমাত্র বাণিজ্যিক মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেটি নিয়মিত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করছে। মহাকাশ এখন নতুন অর্থনৈতিক সীমানা—এখানেও মাস্কের দাপট প্রকট।
মতামত নির্মাণের ক্ষমতা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ কেনার পর পৃথিবীর রাজনৈতিক আলোচনা, সংবাদ প্রবাহ এবং জনমত তৈরিতে তার ভূমিকা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
এ তিন খাতের সমন্বয়ে মাস্ক এখন শুধু ব্যবসায়ী নন, বৈশ্বিক নীতি ও রাজনীতিতেও পরোক্ষ প্রভাবশালী।
২. টিম কুক (অ্যাপল):
টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক প্রযুক্তি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। যদিও তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কম আসেন কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতায় এবং ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতায় তার তুলনা নেই।
উদ্ভাবন ও নকশার নতুন ধারা: স্মার্টফোন, পরিধানযোগ্য যন্ত্র এবং সার্ভিস খাতে অ্যাপলের নতুন নতুন উদ্ভাবন কুকের সময়েই এসেছে। পণ্যের গুণগত মান, নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা—তার নেতৃত্বে কোম্পানির মূল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
রাজস্ব ও বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য: বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ অ্যাপলের পণ্য ও সেবা ব্যবহার করে, যার ফলে অ্যাপলের বাজারমূল্য ও রাজনৈতিক প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়।
৩. সত্য নাদেলা (মাইক্রোসফট):
সত্য নাদেলার নেতৃত্বে মাইক্রোসফট তার ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
ক্লাউড প্রযুক্তির বিস্তার: আজ বিশ্বের অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের ক্লাউড অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এর মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ, ডেটা নিরাপত্তা ও ব্যবসার স্থায়িত্বে মাইক্রোসফট অনিবার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযোজন: বিভিন্ন সফটওয়্যার ও ব্যবসায়িক সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার উন্মুক্ত করে দিয়ে নাদেলা প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা আরও ত্বরান্বিত করেছেন।
৪. জেনসেন হুয়াং (এনভিডিয়া): (বিশ্বব্যাপী এআই বিপ্লবের কারিগর):
জেনসেন হুয়াং ২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি নেতাদের একজন, কারণ এনভিডিয়া এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যালগরিদমের মূল চালিকা শক্তি।
এআই চিপের একচ্ছত্র সম্রাট: বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রশিক্ষণ ও গণনায় এনভিডিয়ার চিপ ব্যবহার করে। ফলে শুধু প্রযুক্তি নয়, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা এবং গবেষণার সবখানেই তাদের প্রভাব রয়েছে।
ডেটা কেন্দ্রের পুনর্গঠন: এনভিডিয়ার শক্তিশালী চিপ এখন বিশ্বের প্রতিটি বৃহৎ ডেটা কেন্দ্রের অপরিহার্য অংশ। হুয়াং-এর সিদ্ধান্তে এই শিল্পে নতুন ধারা তৈরি হয়েছে।
৫. অ্যান্ডি জ্যাসি (অ্যামাজন): (ই-কমার্স ও ক্লাউডের যুগ্ম শক্তি):
অ্যান্ডি জ্যাসির নেতৃত্বে অ্যামাজন শুধু অনলাইন বাজারেই নয়, বরং সরবরাহব্যবস্থা, ক্লাউড, বিনোদন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
বৈশ্বিক সরবরাহ জালের নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পণ্যের সরবরাহ, গুদামব্যবস্থা এবং বিতরণ অ্যামাজনের উপর নির্ভরশীল যা জ্যাসির প্রশাসনিক দক্ষতার ফল।
ক্লাউড সার্ভিসে আধিপত্য:
অ্যামাজনের ক্লাউড সেবা অর্থনীতি, সরকারি অফিস, ব্যাংক, স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
৬. বের্নার্ড আরনো (এলভিএমএইচ): (বিলাসপণ্যের সাম্রাজ্যের শাসক):
বিলাস সামগ্রীর ক্ষেত্রে এলভিএমএইচ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যার মালিক বের্নার্ড আরনো।
বিলাসপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ: ডিজাইন, ব্র্যান্ড-পজিশনিং, বিপণন এবং সেলিব্রিটি সংস্কৃতির ওপর এলভিএমএইচ-এর প্রভাব এতটাই বেশি যে বিলাসপণ্য বাজারের দিকনির্দেশ বহু ক্ষেত্রে আরনোর সিদ্ধান্তে তৈরি হয়।
বহুখাতীয় বিনিয়োগ: ফ্যাশন, সুগন্ধি, মদ, গহনা সব ক্ষেত্রেই আরনো অদ্বিতীয়।
৭. সুন্দর পিচাই (গুগল): (বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রবাহের রক্ষক):
গুগল হলো আধুনিক তথ্যপ্রবাহের কেন্দ্রবিন্দু। সুন্দর পিচাই এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের তথ্য ব্যবহার, অনুসন্ধান, বিজ্ঞাপন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেন।
ডেটা-নির্ভর অর্থনীতির দিশারি:
গুগলের অনুসন্ধান ব্যবস্থা, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি এবং মোবাইল ফোন পরিচালন ব্যবস্থা তাকে তথ্যভিত্তিক ব্যবসার শীর্ষে রেখেছে।
নিয়ন্ত্রণ ও নীতি-পরিবর্তনে প্রভাব: গোপনীয়তা, ডেটা নিয়ন্ত্রণ, বিজ্ঞাপনবিষয়ক আইন—সবখানে গুগল একটি কেন্দ্রীয় পক্ষ।
৮. মুকেশ আম্বানি (রিলায়েন্স): (ভারতের শিল্পনেতৃত্বের সবচেয়ে বড় মুখ):
মুকেশ আম্বানি এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, খুচরা বিক্রয় তিন খাতে তার ব্যবসা ভারতের অর্থনীতির বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
ডিজিটাল সেবার বিস্তারে বিপ্লব: রিলায়েন্স জিও ভারতের কোটি মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরণ বদলে দিয়েছে। কম খরচে বেশি সুবিধা দিয়ে তারা দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় শুরু করেছে।
খুচরা বাজারে দাপট: ভারতের খুচরা পণ্যের বিপুল বাজারও রিলায়েন্সের নিয়ন্ত্রণে। ফলে রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণেও তার পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে।
৯. মেরি বাররা (জিএম): (নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী প্রতীক):
মেরি বাররা বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটির শীর্ষস্থানীয় নির্বাহী। তিনি গাড়ি শিল্পে বিদ্যুৎচালিত যান এবং রোবোটিক প্রযুক্তি দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন এনেছেন।
যানবাহনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক: বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিনিয়োগ, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা মান বাস্তবায়নে বাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
১০. স্যাম অল্টম্যান (ওপেনএআই): (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নির্মাতা):
বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ স্যাম অল্টম্যান। তার প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই নতুন নতুন বুদ্ধিমান প্রযুক্তি উন্মোচন করে বিশ্বব্যাপী কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা সবখানেই বিপ্লব ঘটাচ্ছে।
মানুষ-যন্ত্র সম্পর্কের নতুন যুগ: সমাজে প্রযুক্তির নৈতিকতা, নিরাপত্তা এবং মানব-যন্ত্র সহাবস্থান নিয়ে আলোচনায় অল্টম্যান গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে।
এই দশজন ক্ষমতাধর ব্যবসায়ীক নেতা শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানে নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, নীতি, প্রযুক্তি এবং সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে নেতৃত্ব তালিকায় অধিকাংশই প্রযুক্তি-চালিত খাত থেকে যা নির্দেশ করে যে ভবিষ্যতের ক্ষমতা প্রযুক্তির হাতে। কোটি কোটি ব্যবহারকারী, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, ব্যাংক ও মিডিয়া সবখানে তাদের ব্যবসার প্রভাব দেখা যায় এবং তাদের সিদ্ধান্তে খাতের দিকনির্দেশনাও বদলে যায়। ২০২৫ সালের এই তালিকা প্রমাণ করে বিশ্বে ক্ষমতা এখন আর শুধু অর্থের ওপর নয় বরং প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, তথ্যপ্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। এই দশ নেতা শুধু ব্যবসায়ের শীর্ষে নন; তারা মানবসভ্যতার পরবর্তী পর্যায়ের পথনির্দেশও করছে।
Posted ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
Arthobiz | zaman zaman


