মঙ্গলবার ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিনিশড গুডস ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ঘোষণা দিয়ে রেয়াতি সুবিধায় রেডিমেড পণ্য আমদানি করছে হায়ার বাংলাদেশ

  |   সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   43 বার পঠিত

ফিনিশড গুডস ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ঘোষণা দিয়ে রেয়াতি সুবিধায় রেডিমেড পণ্য আমদানি করছে হায়ার বাংলাদেশ

অর্থবিজ প্রতিবেদক :
স্থানীয়ভাবে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে সরকারের দেয়া রয়াতি শুল্ককর সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রতিষ্ঠান হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে| অভিযোগ, স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন আমদানি করছে| এমনকি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ভিআরএফ (ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো) এসি আমদানির অভিযোগও রয়েছে|
শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে সরকার একদিকে বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে প্রকৃত স্থানীয় উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছেন| তারা হায়ার বাংলাদেশের আমদানি, উৎপাদন সক্ষমতা, আইআরসি এবং রেয়াতি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন| অভিযোগ অস্বীকার করে হায়ার বাংলাদেশ বলেছে, সরকারের নিয়ম ও সংশ্লিষ্ট এসআরও মেনেই তারা ব্যবসা করছে|
স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে দেয়া সুবিধায় দেশে এসি শিল্প গড়ে তুলতে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার অংশ হিসেবে সরকার শুল্ক ও ভ্যাটে রেয়াতি সুবিধা দিয়ে আসছে| এর উদ্দেশ্য দেশে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানি-নির্ভরতা কমানো| সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ সুবিধা নিতে হলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়| এসি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কম্পোনেন্টের মধ্যে অন্তত তিনটি দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকতে হয়| এগুলো হলো ইনডোর ইউনিট, আউটডোর ইউনিট, কনডেনসর, এভাপোরেটর এবং সাকশন অ্যান্ড ডিসচার্জ পাইপ| এ জন্য শুধু উৎপাদনের ঘোষণা দিলেই হয় না; প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতাও থাকতে হয়|
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হায়ার বাংলাদেশ এসব শর্তের আওতায় সুবিধা নেওয়ার পরও ওই কম্পোনেন্টগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করছে| অভিযোগটি সত্য হলে তা সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন তোলে|
হায়ার বাংলাদেশের আমদানি-সংক্রান্ত নথিতে একই ই-টিআইএন ও ঠিকানার অধীনে প্রতিষ্ঠানটির নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) ও কমার্শিয়াল আইআরসি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে| শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে হায়ার একদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারী হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইআরসির আওতায় সুবিধা নিচ্ছে অন্যদিকে কমার্শিয়াল আইআরসি ব্যবহার করে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আনছে|
একই বিআইএন ও টিআইএনের অধীনে এভাবে দুই ধরনের আইআরসি ব্যবহারের বৈধতা এবং এর মাধ্যমে রেয়াতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা| তাদের মতে, আমদানি ও উৎপাদন-দুই কার্যক্রমে কোন আইআরসি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোন শুল্ককর সুবিধা নেওয়া হয়েছে তা বিল অব এন্ট্রি ও সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন|
ক্যাপিটাল মেশিনারিজে ৯৮টি রেডিমেড এসি হায়ার বাংলাদেশের ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে ৩ লাখ বিটিইউ ক্ষমতার সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আমদানি করেছে| এগুলো মূলত ভিআরএফ এসি| এ সময়ে মোট ৯৮টি রেডিমেড সেন্ট্রাল এসি আমদানি করা হয়েছে| অভিযোগ রয়েছে, এসব এসি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাস করা হয়েছে|
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ক্যাপিটাল মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে সরকার বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে থাকে| সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সম্পূর্ণ তৈরি এসিকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ দেখিয়ে আমদানি করা হলে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে| এ ধরনের পণ্য প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত মূলধনী যন্ত্র কি না, নাকি সরাসরি বিক্রিযোগ্য ফিনিশড গুডস-তা কাস্টমস নথি ও পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন|
এসি ছাড়াও হায়ার ৩৬৯ লিটার ধারণক্ষমতার ১৪৮টি রেডিমেড চেস্ট ফ্রিজার আমদানি করেছে| পাশাপাশি আমদানি করা হয়েছে ৪৪৮টি এসি কম্প্রেসর ও ৪৪৮টি এসি মোটর|

তিন বছরে ৪৫ হাজার ওয়াশিং মেশিন হায়ার ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন আমদানির তথ্যেও বড় পরিমাণের চিত্র পাওয়া গেছে| ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ থেকে ১৪ কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন মডেলের মোট ৪৫ হাজার ৬৪টি ওয়াশিং মেশিন আমদানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি| এর মধ্যে ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৮১৭টি, ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৫২২টি, ২০২৫ সালে ২০ হাজার ৪৬১টি এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬ হাজার ২৬৪টি আমদানি হয়েছে| সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে ২০২৫ সালে|
শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, স্থানীয় উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি করা হলে তা সরকারের শিল্পনীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ| একইসঙ্গে এসব পণ্যের আমদানিতে কোন আইআরসি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কী হারে শুল্ককর পরিশোধ করা হয়েছে সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা|
ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে স্থানীয় শিল্প স্থানীয় এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদনকারী হিসেবে শুল্ককর সুবিধা নিয়ে একইসঙ্গে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করলে প্রকৃত উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়বেন| তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে| বিপরীতে একই সুবিধা নিয়ে তৈরি পণ্য আমদানি করা হলে তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি পড়ে| এতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে|
তারা হায়ার বাংলাদেশের বিল অব এন্ট্রি, আমদানি তথ্য, আইআরসি, উৎপাদন লাইন, কারখানার সক্ষমতা এবং এসআরওর আওতায় নেওয়া সুবিধা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন| অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে দেওয়া নীতি-সুবিধা যদি সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানিতে ব্যবহৃত হয় তাহলে সরকারের শিল্পনীতির উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে| একইসঙ্গে রাজ¯^ আদায় ও ন্যায্য প্রতিযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে| তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি অনুমান বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়; আমদানি নথি, উৎপাদন রেকর্ড, কারখানার সক্ষমতা এবং রেয়াতি সুবিধার শর্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত|
‘শর্ত ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা’ এ বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে শিল্প গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বাড়াতে সরকার এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা দিচ্ছে| এর প্রধান শর্ত স্থানীয়ভাবে ফিনিশড গুডস উৎপাদন| তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এসআরওর শর্ত ভেঙে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির নামে ফিনিশড গুডস আমদানি করে সুবিধা নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে| হায়ার বাংলাদেশ এমন সুবিধা নিয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে|
ফিনিশড গুডসকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি| কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট বিষয়টি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবে|

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৩:২০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

Arthobiz |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191