মঙ্গলবার ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষি ও পল্লি ঋণে ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য

  |   সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   8 বার পঠিত

কৃষি ও পল্লি ঋণে ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য

অর্থবিজ প্রতিবেদক :
কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক| নতুন অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি| একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে|
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন| একই অনুষ্ঠানে কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালার ব্যবহার সহজতর এবং নীতি প্রণয়নে তথ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করা ওয়েবভিত্তিক ‘এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস সফটওয়্যার’ উদ্বোধন করা হয়|
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, চিফ ইকোনমিস্ট, নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকসহ কৃষি ঋণ বিভাগের কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন|
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে পল্লি অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো| কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে|
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে| এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য ২০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ৩৯ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে|
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা| সে হিসাবে এবার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা| শতাংশের হিসাবে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ| কৃষি খাতে ঋণের চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে|
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| এ খাতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৫ একর পর্যন্ত জমিতে লবণ উৎপাদনের জন্য নীতিমালায় বর্ণিত চার্জ ডকুমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো চার্জ ডকুমেন্ট গ্রহণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে| এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার সুযোগ ˆতরি হবে|
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণে ছাড়পত্রের পরিবর্তে জমির ¯^ত্ব বা মালিকানা সংক্রান্ত সহজতর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অর্থায়নে বিকল্প জামানত ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে| এর মধ্যে ব্যক্তিগত জামানত, সামাজিক জামানত ও দলগত জামানতের মতো ব্যবস্থা রয়েছে|
কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ আরও কার্যকর করতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কমন ফান্ড’ পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালাও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| পাশাপাশি মৎস্য চাষ ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাংকগুলোকে একক বা দলবদ্ধ কৃষক ও খামারির অনুকূলে ঋণ বিতরণে আরও নমনীয় হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে| নতুন নীতিমালায় কয়েকটি বিশেষ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের বিষয়টি কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| এর ফলে প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক নতুন ও বিকল্প কর্মকাণ্ডেও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রবাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে|

এ ছাড়া ১০ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন এবং ৩ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সংক্রান্ত নীতিমালা সংযোজনের বিষয়টিও নতুন কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে| এসব পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে কৃষি ও পল্লি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে|
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি খাতে ব্যাংক ও কৃষক বা গ্রাহকের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতির ভিত্তিতে গ্রাহককে বীমা সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে|
কৃষিভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উৎপাদনেও ঋণ সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| শিশুমূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, রোজেলা, মাশরুম, শালবীজ, বেল, বরইয়ের ফল এবং ডিমের খোসা দিয়ে ˆজব সার উৎপাদনের মতো উদ্যোগকে কৃষি ঋণের আওতায় আনার বিষয়টি নীতিমালা ও কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে|
এ ছাড়া সারা বছর ধরে কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচুর মতো ফলের বাগান ও ফলনকেন্দ্রিক কৃষি কর্মকাণ্ডে ঋণ বিতরণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে| একই সঙ্গে ফসল সংগ্রহের পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে| এতে কৃষকের আয় ও ফসল বিক্রির সময়ের সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সময়কে সামঞ্জস্য করার সুযোগ ˆতরি হতে পারে|
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়নে কৃষি ও পল্লি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে| তাই নতুন অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালায় একদিকে যেমন ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে|
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক| এখন এই নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নির্ধারিত ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রকৃত কৃষক ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ|

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৭:২৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

Arthobiz |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191