শুক্রবার ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিতর্কীত বক্তব্যের জন্য দু:খ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়ে গভর্নরকে চিঠি : কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের তোপের মুখে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম রেজা

  |   রবিবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   119 বার পঠিত

বিতর্কীত বক্তব্যের জন্য দু:খ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়ে গভর্নরকে চিঠি :  কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের তোপের মুখে  ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম রেজা

অহিদুজ্জামান মিঞা :
বিতর্কীত বক্তব্য দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তোপের মুখে পড়েছেন ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন। বক্তব্যের জন্য দু:খ প্রকাশ এবং নি:শর্ত ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিয়েও রেহায় পাচ্ছেন না তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা তাকে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি পদ থেকে অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবী জানিয়ে আলটিমেটাম দেয় কর্তৃপক্ষকে। ১২ ডিসেম্বর এই আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ব্যাংক কর্মকর্তারা আরও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা বলেছেন, আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় তাদের কর্মসূচী অব্যাহত রয়েছে। এ প্রতিবেদন লেখা পযর্ন্ত আন্দোলনকারি কর্মকর্তারা তাদের আলটিমেটাম প্রত্যাহার করেন নি। ফলে আন্দোলন চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক হুসনে আরা শিখা এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, যেহেতু আলটিমেটামটি প্রত্যাহার করা হয়নি, সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে আনোদলন চলমান রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে দেয়া আলটিমেটাম অব্যাহত রয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে হুসনে আরা শিখা বলেন, এটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপর। হুট করেইতো আর কোন পদক্ষেপ নেয়া যায় না। তবে তার বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতি আমানতকারিদের আস্থায় চির ধরতে পারে। ব্যাংক সেক্টরের ভাবমূর্তি রক্ষায় সবকিছু বুঝেশুনে প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে।
জানা গেছে, গত ০৫ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুক্তিযোদ্ধা সংসদে অনুষ্ঠিত সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যানারে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ প্রতিবাদ সভায় ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি) এর চেয়ারম্যান সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেনের বিতর্কীত বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে তাকে অবিলম্বে এমডি’র পদ থেকে বহিষ্কার দাবী জানানো হয়। সেলিম রেজা ফরহাদ পরিস্থিতি নাজুক দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাবর চিঠি দিয়ে তার বক্তব্যের জন্য দু:খ প্রকাশ এবং নি:শর্ত ক্ষমা প্রাথর্ণা করেন। কিন্তু এই চিঠি দেয়ার পরও কেন্দ্যীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন নাই।
ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন এবিবি চেয়ারম্যান হিসাবে গত ৪ ডিসেম্বর বিআইবিএম-টাস্কফোর্সের সভায় দেয়া তার বক্তব্যে ব্যাংক সেক্টরে আজকের নাজুক অবস্থার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়ি করেন। এ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ব্যাংক সেক্টরে আজকের এই নাজুক অবস্থার জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগস্ট পূর্ববর্তী সময়ের শীর্ষ কর্মকর্তারাও দায়ি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সে সময়ের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা পদের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি পদোন্নতি বদলি এবং লোন প্রদানে সুপারিশ করেছেন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উপর তারা সব সময়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে নাই। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকেও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতেন। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তার এই বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা ফুঁসে উঠেন। তারা সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেনের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি) এর চেয়ারম্যান এবং ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেনের দেয়া এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তার ব্যানারে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, কোন রকম তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই জনসম্মুখে এ ধরনের বক্তব্য দেয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং ব্যাংক সেক্টরে আমানতকারিদের আস্থায় চির ধরেছে। এ ঘটনায় তারা ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে তাকে ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তার বক্তব্যের স্বপক্ষে দালিলিক প্রমান দেখাতে ব্যর্থ হলে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে তাকে স্থায়ী বরখাস্তের দাবি জানান।
এ দিকে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন তার বক্তব্যের জন্য নি:শর্ত ক্ষমা চেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ৮ ডিসেম্বর দেয়া এক পত্রে তার দেয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থণা করার পাশাপশি তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়ারও ঘোষণা দেন।
সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন পত্রে উল্লেখ করেন, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি) এর চেয়ারম্যান হিসাবে আমার বক্তব্য অনেকের কাছে অনভিপ্রেত এবং অসঙ্গত মনে হয়েছে। এ কারনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকর্মীগনও আমার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের সেই ক্ষোভের কথা তারা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়ে এ বক্তব্যের জন্য আমার নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থণা করার দাবি জানান। তাদের দাবি মেনে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং আমার বক্তব্যের যে অংশটুকু তাদের বেশি ক্ষুব্ধ করেছে, সেটি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবাদি কর্মকর্তারা ব্র্যাক ব্যাংকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (এমডি) পদে সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেনের নিয়োগ অনুমোদনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। তারা বলেন, ডিএমডি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বৈরাচার সরকারের দোসরদের বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়ে কিভাবে এমডি’র চাকরি পেয়েছেন। এ জন্য তিনি কাকে কি বেনিফিট দিয়েছিলেন, তার তথ্য তাকে দিতে হবে।
আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের পক্ষে মিডিয়ায় পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নীতিমালা লংঘন করে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বিপুল বেতন ভাতায় পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংকের এমডির চাকরি পান সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন। আইডিএলসিতে থাকাকালে পিকেহালদার সংশ্লিষ্ট বেনামী প্রতিষ্ঠান ক্লিস্টোন গ্রুপের আবদুল আলীমকে কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। আর্থিক অনিয়মের কারণে তার আপনভাই সেলিম রহামান সিটি ব্যাংকের এমডির পদ ছাড়তে বাধ্য হন। পরে তারই প্রভাব ও প্রতিপত্তিতে সেলিম রহমান আবার ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
তারা বলেছেন, ৫ আগস্টের পর সন্দেহভাজন সকলের বিদেশ ভ্রমনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন প্রভাব খাটিয়ে বিদেশ যেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতির শর্ত তুলে দিয়ে ব্যাংক লুটেরা প্রধান নির্বাহীদের বিশেষ করে ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের নির্বাহীদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিয়েছেন। ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সময়ে ব্যাঙ্কিং খাতে সংঘটিত আর্থিক দুর্নীতির সাথে তার সম্পৃক্তায় তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
তারা আরও অভিযোগ করেন ডিপোজিটরদের টাকায় তিনি পুরো সিনেমা হল ভাড়া করে “ চিরঞ্জীব মুজিব” সিনেমা প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যারা ওই সিনেমা দেখতে যাননি তাদেরকে হয়রানি করা হয়। তারা আরও বলেন, তার বক্তব্য ডিপোজিটরদের ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী করেছে যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এধরনের বক্তব্য ব্যাংকিং খাতের শ্বেতপত্রের ভিত্তিতে চিহ্নিত লুটেরাদের বাঁচানোর অপচেষ্টা মাত্র। সেলিম তার বক্তব্যের সত্যতা দালিলিক প্রমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দাখিল করবেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কে/কারা, কি জন্য তাঁকে ব্লাকমেইল করেছিল এবং তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসিয়ালদের কী ধরনের বেনিফিট কিভাবে দিয়েছিলেন, সে তথ্য তাকে দিতে হবে।

 

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ২:৫৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪

Arthobiz |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191