শুক্রবার ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশেষ প্রতিবেদন

রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ

  |   সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   76 বার পঠিত

রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ

এম এ মাসুম :
শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলাতে নয়, বরং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি, পরিবার ও পরিবেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অবদান নিছক অনুভূতির বিষয় নয়-এটি কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেকর্ড ৩২.৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন-যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগের বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২৬.৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয়ভাবে বাজার থেকে ডলার কেনার পদক্ষেপ নিয়েছে। গত অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোট ৩.১৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ক্রয়ের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক হিসাব মান ইচগ৬ অনুযায়ী এই রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৮.৫২ বিলিয়ন ডলার যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
উল্লেখ্য, দেশের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের আগস্টে, যখন তা ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে সেই উত্থান আর বজায় থাকেনি। বিভিন্ন অর্থনৈতিক চাপ ও আমদানি ব্যয় মেটাতে ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এর ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ধাপেই রিজার্ভ নেমে আসে মাত্র ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মানসুর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যে রেমিট্যান্স প্রবাহকে দেশের অর্থনৈতিক ¯ি’তিশীলতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, গত অর্থবছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রমের ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী। একথা সত্য যে, রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে, অর্থনীতিকে ¯ি’তিশীল করেছে এবং লক্ষ লক্ষ পরিবারে স্ব”ছলতা এনেছে। কিন্তু এতসব সফলতার পেছনে যে মানবিক বাস্তবতা রয়েছে, তা অনেক কঠিন। প্রবাসী শ্রমিকরা অর্থনীতির নায়ক হলেও নিজেরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির শিকার। তাদের জীবন নিরাপদ নয়, পথ মসৃণ নয়, অভিজ্ঞতা গৌরবময়ও নয় বরং শোষণ, অবহেলা, প্রতারণা, মানবপাচার ও মৃত্যু যেন তাদের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
দালাল-সিন্ডিকেটের দৌরাত্ন ও ঋণের ফাঁদ
বাংলাদেশের অভিবাসন প্রক্রিয়া বহুদিন ধরেই বিশৃঙ্খল ও দুর্নীতিতে ডুবে আছে। সরকার নির্ধারিত খরচ যেখানে কয়েক লাখ টাকার মধ্যে ঘোষনা করা হয়, বাস্তবে মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল ও সাবুএজেন্টের দৌরাত্বের খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ থেকে ১০ গুণ। ফলে সম্ভাব্য শ্রমিকরা বিদেশে পাড়ি দেয়ার আগেই ঋণবন্দী হয়ে পড়েন। কোনরকম বিদেশে পৌঁছার পরপরেই জানতে পারে নানারকম সমস্যার কথা প্রতিশ্রুত চাকরি নেই, মজুরির পরিমাণ একেবারেই অপ্রতুল, কাজের পরিবেশ অমানবিক, চুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে কাজ ও মজুরির অমিল।
অনেকেই অসুস্থ হন, নির্যাতিত হন কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা সাহায্য পান না। সংবাদমাধ্যমে
প্রায়ই তরুণদের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়, যাদের অনেকেই পরিবারকে সামান্য রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে লাশ হয়ে দেশে ফেরেন। ভুয়া সনদে দেশের ক্ষতি
প্রধান উপদেষ্টার ড. মুহাম্মদ ইউনুস সাম্প্রতিক বক্তব্য অভিবাস কার্যক্রমের বাস্তবতার নির্মম চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান ইউরোপের একটি দেশে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া এক বাংলাদেশি নিজেকে ডাক্তার দাবি করে সব কাগজ জমা দিলেও নিয়োগকর্তা তাকে খুব বেশি হলে গৃহকর্মী ভাবার মতো সন্দিগ্ধতা দেখিয়েছে। অন্যান্য যেসব সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের সনদ ও দক্ষতার উপর আস্থা কম, জাল সার্টিফিকেট বাজারে সহজলভ্য, প্রশিক্ষণ মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, বাস্তব দক্ষতার যাচাই প্রক্রিয়া নেই। দক্ষতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই ফলে মালয়েশিয়া, ইতালি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ অতীতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ ¯’গিত করেছে এবং এখনো নানা সতর্কতায় চলেছে। অদক্ষতার দায় ও রেমিট্যান্সের আকাশুপাতাল বৈপরীত্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিদেশ যাচ্ছে, কিন্তু সেভাবে রেমিট্যান্স আসছেনা। পরিসংখ্যান বলছে: ২০২১ সালে ২১.৭৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে ২১.২৮ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ২১ বিলিয়ন ডলার অথচ ২০২৩ সালে শ্রমিক বেড়েছে প্রায় ১৫%, মোট সংখ্যায় ১৩ লাখ। এর কারণ দুইটি (১) অদক্ষ কর্মীর কারণে স্বল্প বেতন এবং (২) অনেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে না শরণার্থী ও অভিবাসন গবেষণা ইউনিট (জগগজট) এর গবেষণা তথ্য আরও উদ্বেগজনক- ২০২২ সালে অভিবাসী শ্রমিকদের ৭৮.৬৪% অদক্ষ, ২০২৩ সালে কিছু উন্নতি হলেও এখনও অর্ধেকের বেশি শ্রমিক অদক্ষ।
যেখানে দক্ষতা থাকলে মাসে তিন লাখ টাকা আয় সম্ভব, সেখানে অদক্ষ শ্রমিকের বেতন ২০-৩০ হাজার টাকা। এটি শুধু ব্যক্তির নয়, জাতিরও ক্ষতি। জাপানের দরজা খুলছে আমরা কতটুকু প্রস্তুত ?
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য জাপানে
কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জাপান সরকার আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক লাখ দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি দেশের জন্য একটি বিরল সুযোগ, কারণ বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশ জাপানে কাজ করার সুযোগ মানেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উচ্চ বেতন, এবং পেশাগত উন্নতির পথ সুগম হওয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে যারা জাপানে যাবেন, তাদের শুধু সেখানে কাজের সুযোগই নয়—যোগ্যতা, দক্ষতা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে অব¯’ানের সুযোগও থাকবে। অনেক ক্ষেত্রেই এ শ্রমিকেরা নির্দিষ্ট সময় কাজ করার পর দক্ষতার ভিত্তিতে চাকরির মেয়াদ বাড়াতে এবং ¯’ায়ীভাবে থাকতে পারবেন। ফলে তারা দেশে পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আয় নিশ্চিত করতে
পারবেন। তাঁর মতে, এই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে জাপানগামী এক লক্ষ শ্রমিক শুধু নিজেদের জীবনই বদলে দেবেন না, বরং দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখবেন। কারণ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে কাজ করা শ্রমিকরা সাধারণত উ”চ আয় করে থাকেন, ফলে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সও বেশি হয়। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থি’তিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশীয় শ্রমশক্তির জন্য বিশ্ববাজারে নতুন দরজা খুলে গেলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ এখনও নানা সমস্যায় ভুগছে—যেমন দক্ষতার স্বল্পতা, ভাষা না জানা, এবং দালালচক্রের প্রতারণা। তাই সরকার এখন থেকে বিদেশে গমনকারী প্রত্যেক শ্রমিককে প্রশিক্ষিত, প্রমাণিত ও যোগ্য করে গড়ে তোলার ওপর জোর দি”েছ। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, জাপানের বাজারে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য ভাষা, কারিগরি জ্ঞান এবং নৈতিক কর্মসংস্ক…তি রপ্ত করা অত্যাবশ্যক। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন—বাংলাদেশ যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা নেয় এবং শ্রমিকদের যোগ্য করে গড়ে তোলে, তাহলে জাপানসহ আরও উন্নত দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ দ্রুত বাড়বে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটি নতুন উ”চতায় পৌঁছে দেবে। জাপানে যেসব কর্মীর চাহিদা বেশি তাহলো: নার্স ও কেয়ারগিভার নির্মাণশিল্প কর্মী
কৃষি ও খাদ্যশিল্প কর্মী আইটি ও কারিগরি টেকনিশিয়ান হোটেলুরেস্তোরাঁ সেবা কর্মী কৃষি খামার শ্রমিক তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এমন সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা কি আমাদের আছে? মূলত চারটি কারণে বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিদেশে অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না: ১. দালালুনির্ভর নিয়োগব্যবস্থা ২. নকল সনদের বিস্তার ৩. দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের ঘাটতি ৪. বাজার চাহিদা বিশ্লেষণের ঘাটতি
বাংলাদেশ এতদিন মূলত গালফ অঞ্চলের উপর নির্ভর করেছে, যেখানে নিু ও আধা দক্ষ শ্রমের চাহিদা বেশি। কিন্তু বিশ্ব শ্রমবাজার এখন দ্রুত বদলা”েছ গালফ নয়, পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উন্নত অর্থনীতিগুলো বেশি সুযোগ দিচ্ছে—আর বাংলাদেশের জায়গা হওয়া উচিত সকল দেশেই। তাই প্রবাসীদের কল্যানে বেশকিছু সেক্টরে ব্যাপক সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেয়া প্রয়োজন:
১. দালালমুক্ত স্বচ্ছ ব্যবস্থা ২. দক্ষতা ও ভাষা প্রশিক্ষণ ৩. সনদের সঠিকতা নিশ্চিতকরণ ৪. ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন প্রবাসী শ্রমিকরা শুধু টাকা পাঠান না-তারা বাংলাদেশের পরিচয় বহন করেন, বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষা ছড়িয়ে দেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির পাটাতনকে মজবুত করেন। রাষ্ট্রের উচিত এইসব প্রবাসী যোদ্ধারা যাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্তবাবে প্রবাসে গমণ করেন এবং সম্মানের সাথে কাজ করেন । অভিবাসন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল, দক্ষতানির্ভর ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হলে শুধু ৩০ বিলিয়ন নয়-এ দেশ ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু দেশের ভেতর নয়-বিশ্বের শ্রমবাজারেও রচিত আছে। পথ তৈরি করতে হবে, বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে এবং আমাদের রেমিট্যান্স যোদধাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হবে-এটাই সময়ের দাবি।
লেখক: ব্যাংক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৫:৩০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬

Arthobiz |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191