বুধবার ২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামী বীমা ও প্রচলিত বীমা

  |   বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   38 বার পঠিত

ইসলামী বীমা ও প্রচলিত বীমা

মুহাম্মদ নুরুল আলম চৌধুরী (ফেরদৌস),
লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাউথ এশিয়া ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড
“বণিকের মানদন্ড দেখা দিল রাজদন্ড রূপে পোহালে শর্বরী”-একসময় বণিকবেশী ইংরেজরা বাণিজ্য বসতের ছত্রছায়ায় শুধু এ উপমহাদেশেই নয়, প্রায় সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শাসন ও জনগণকে শোষণের চুড়ান্ত করে অবশেষে প্রকৃতির আমোঘ নিয়মে বিদায় নিয়েছে|
অবশ্য আজিকার আধুনিক বিশ্বে সহজে কোন দেশ শক্তির জোরে অপর কোন দূর্বল দেশ জয় করে শাসন-শোষণের হাতিয়ার চালাতে পারে না| পারা সম্ভবও নয়| তাই আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে উন্নত দেশসমূহ তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রচ্ছন্ন থাবা বিস্তার করে তাদের পূর্বেকার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে সতত সচেষ্ট| এ প্রেক্ষাপটে বর্তমানের আধুনিক বিশ্বে যে কোন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ব্যাংক ব্যবসার পাশাপাশি বীমা শিল্পে বিশেষতঃ সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা শিল্প এক উজ্জল ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে|
প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে দীর্ঘ স্থলপথ ভ্রমন ও জলপথে নৌ-ভ্রমনের মাধ্যমে ইউরোপীয়গন বীমা শিল্পের গোড়া পত্তন করেন, যা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়| ইসলামের আবির্ভাবের দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রথমবাবের মতো সাধারণভাবে ইসলামী বীমা ব্যবস্থার প্রচলন হয় এবং ক্রমাš^য়ে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে| এটা এমনি এক সময় ঘটে, যখন আরবের মুসলমান বণিকেরা ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নৌ-পথে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে থাকেন| তখন তারা দলবদ্ধভাবে যৌথ তহবিল গঠন করতেন এবং প্রয়োজনে এ যৌথ তহবিল হতে একে অন্যের দিকে সাহায্য সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করে দিতেন; অর্থাৎ কেউ কোনরূপ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কোন প্রকার ব্যবসায়িক লোকসানের কবলে পতিত হলে গঠিত যৌথ তহবিল থেকে তাকে ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তা দান করা হতো| এমতাবস্থায় ব্যবসা পুনর্গঠন, পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতি ও ¯^চ্ছলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ও ক্ষতি লাঘব করার নিমিত্তে বাস্তব জীবনে বীমা ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজনীয় তথা অপরিহার্য বলে ইসলামী শরীয়াহ& বিশারদ ও চিন্তাবিদগণ পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণের জন্য ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন|
বর্তমানে মুসলমানদের জন্য অতীব গর্বের বিষয় যে, অধুনা বিশ্বে মুসলিম দেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন অমুসলিম দেশও সহযোগীতা ও কল্যাণের মূর্ত প্রতীক ইসলামী বীমা ব্যবস্থা চালু করেছে| অতীব আনন্দের কথা এ ব্যাপারে বাংলাদেশও আজ পিছিয়ে নেই| আমাদের দেশেও অতি সাম্প্রতিক প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার পাশাপাশি ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে| ইসলামী বীমা ব্যবসার ত্বরিত প্রভূত প্রসারে এটা পরিষ্কারভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, এদেশে আরো আগে এ ইসলামী বীমা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অবদান রাখতে সক্ষম হতো| তবে নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই, আগামী দিনগুলো এর ¯^াক্ষর রাখবে বলে আমাদের দৃঢ় প্রতিতী| এছাড়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ইসলামী বীমার জন্য নতুন আইন প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন, যা এই সেক্টরের জন্য আর একটি মাইল ফলক| এক্ষণে ইসলামী বীমা ও প্রচলিত বীমা ব্যবস্থা ও ধারণার মধ্যে যেসব মৌলিক পার্থক্যগুলো বিদ্যমান তার তুলনামূলক বিবরণ নিম্নে বর্নিত হলোঃ ১. ইসলামী বীমা শরীয়াহ& অনুযায়ী পরিচালিত| প্রচলিত বীমায় এ ধরনের কোন শরীয়াহ& পালন করা হয় না| ২. পারস্পরিক কল্যাণ ও সহযোগিতাই ইসলামী বীমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য| মুনাফা অর্জনই প্রচলিত বীমার একমাত্র ও প্রাথমিক লক্ষ্য| ৩. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতার মধ্যে প্রতিনিয়ত সুসম্পর্ক বজায় থকে| প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় তা কম দেখা যায়| ৪. ইসলামী বীমা যেহেতু ইসলামী শরীয়াহ& অনুযায়ী পরিচালিত সেহেতু এতে সকল প্রকার লেনদেন ও বিনিয়োগে সুদ অবশ্যই পরিত্যাজ্য| প্রচলিত বীমায় সকল প্রকার লেনদেন ও বিনিয়োগে সুদ বা রীবার সংস্পর্শ থাকে, এতে কোন প্রকার বাধা নিষেধ নেই| ৫. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বক্তিগতভাবে মুনাফা লাভের প্রশ্ন ওঠে না, যেহেতু এ সংস্থা সমবায়ভিত্তিক| প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে মুনাফা লাভের প্রশ্ন অপরিহার্য| ৬. ইসলামী বীমা ব্যবস্থার সব কর্মকান্ডে ¯^চ্ছতা বজায় থাকে| বীমা পলিসিতে অ¯^চ্ছতা বা ঘারার উপাদান থাকে না| অন্যদিকে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় অ¯^চ্ছতা বা ঘারার উপাদান থাকে| ৭. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বীমা পলিসিতে জুয়ার উপাদান থাকে না| কিন্তু প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় বীমা পলিসিতে জুয়ার উপাদান থাকতেও পারে বলে মনে হয়| ৮. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় মানুষের কল্যাণের জন্য যাকাত বা সাদাকা তহবিল গঠন করা হয়| অপরপক্ষে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় ঐ ধরনের কোন তহবিল গঠনের বিধান নেই| ৯. ইসলামী বীমা শরীয়াহ& মোতাবেক পরিচালনার জন্য একটি শরীয়াহ& কাউন্সিল গঠন করা হয়| প্রচলিত বীমা যেহেতু শরীয়াহ& ভিত্তিক নয়, সেহেতু কোন শরীয়াহ& কাউন্সিল গঠন করার প্রশ্নই ওঠেনা| ১০. ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় সহযোগী সকল সদস্যগণ লাভ-লোকসানের অংশীদার, যেহেতু এ বীমা ব্যবস্থা মুদারারা নীতিতে অংশীদারিত্বের প্রস্থা ভিত্তিতে পরিচালিত| অন্যদিকে প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় এভাবে লাভ-লোকসানের অংশীদার এবং মুদারাবা নীতির কোন ব্যবস্থা নেই|
উল্লেখিত পার্থক্যসমূহ পর্যালোচনান্তে প্রতীয়মান হবে যে, ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় বিশেষ কয়েকটি সুবিধা বিদ্যমান যা এতদসংক্রান্ত ইসলামী শরীয়াহ্র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার সঙ্গে পার্থক্য সূচিত করে| ইসলামে সুদের লেনদেন ও কায়কারবার নিষিদ্ধ বিধায় ইসলামী বীমা ব্যবসার সুদ পরিহার করার ফলে ইসলামী বীমা গ্রহণকারী তথা পলিসি হোল্ডারগণ উভয়েই হালাল মুনাফা তথা হালাল আয় অর্জনের পথ নিশ্চিত করে| এ বীমা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী তথা পলিসি হোল্ডারগনের অংশগ্রহনের ব্যবস্থা বিদ্যমান হেতু ইসলামী বীমা কোম্পানীর উদ্যোক্তা ও অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে লাভলোকসানের হারাহারি বন্টনের মাধ্যমে অংশীদারীত্বের উপাদান বিদ্যমান, যা কিনা প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত| সঞ্চয়ই সমৃদ্ধি বহন করে| ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় অংশীদারীত্বের উপাদান বিদ্যমান থাকায় সমাজের সর্বস্তরের জনগণ, কৃষিজীবি, পেশাজীবি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী সকলেই ইসলামী বীমা-জীবন বীমা, সাধারণ বীমার পলিসি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবেন| ফলে প্রিমিয়াম হিসাবে প্রদত্ত অর্থ বীমা তহবিলে সঞ্চিত হয়ে তহবিল গঠন ও তা বিনিয়োগে সহায়ক হবে| তার ফলে আর্থ-সামজিক উন্নয়নে যথাযথ অবদান রাখবে| এতদভিন্ন ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় শরিয়তসিদ্ধমতে বীমা ব্যবস্থা তথা বীমা ব্যবসা নিশ্চিতকরণ ছাড়াও ইসলামী ন্যায়নীতির ভিত্তিতে আহরিত সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে কুক্ষিগত না হয়ে কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডার ও পলিসি হোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ বন্টনের ফলে সমাজে ন্যায়ানুগভাবে সম্পদের বন্টন নিশ্চিত হবে| তাই ইসলামী ইনসাফের ভিত্তিতে সমাজের সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রসার আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম|

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৩:৩০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

Arthobiz |

advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191