
| রবিবার, ১৯ মে ২০২৪ | প্রিন্ট | 202 বার পঠিত

অর্থবিজ প্রতিবেদক :
প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এক হতদরিদ্র বীমা গ্রাহক মাত্র ৯৮ হাজার টাকার বীমা দাবি না পেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। বীমা গ্রাহক প্রাইম ইসলামী লাইফে বার বার যোগাযোগ করেও কোন প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে গত ১ এপ্রিল আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এই অভিযোগ করার পর দেড় মাস অতিবাহিত হলেও ভূক্তভোগি বীমা গ্রাহক তার দাবী পাওয়া দুরের কথা তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা সে ব্যাপারেও কিছুই জানতে পারেন নি। গত ১৪ মে আইডিআরএ’র প্রধান কার্যালয়ের রিসিপশনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা হতভাগা বীমা গ্রাহক আশরাফুল ইসলাম অর্থবিজকে তার দু:খ হতাশা ও ক্ষোভের কথা জানান।
জানা গেছে, আশরাফুল ইসলাম নামের একজন স্বল্প আয়ের লোক, (আইডি নম্বর-৩২৯৫৫৮৫৭০১, পলিসি নম্বর-ডি-৪০১০২১৭০৯২) দশ বছর আগে মাসিক ১ হাজার টাকা করে দশ বছর মেয়াদি একটি বীমা করেন প্রাইম ইসলামী লাইফে। ডিসেম্বর -২০২৩ তার পলিসিটির মেয়াদ পূর্ণ হয়। কোম্পানির পলিসি ও দাবি বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা ০৪ ফেব্রুয়ারি তার মেয়াদোত্তর দাবির পাশ বই ও দলিল গ্রহন করে তাকে একটি রিসিট দেন এবং পরে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর থেকে তিনি প্রতি সপ্তাহে দু’একবার কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে যেয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করলে তাকে বার বার একই কথা বলা হয়, পরে আসেন। কবে নাগাদ টাকা পাওয়া যাবে জানতে চাইলে কোন জবাব পাননি তিনি। অবশেষে তিনি আইডিআরএ’র দ্বরাস্থ হন। সেখানেও প্রায় একই অবস্থা। তিনি জানতে চান তার অভিযোগপত্রটি কোথায় কার কাছে আছে এবং তিনি বীমা দাবিটি আদৌ পাবেন কিনা।
তিনি অর্থবিজকে জানান, প্রতি মাসে প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়েছেন। তার কোন কিস্তি খেলাপি হয়নি। পলিসিটি একটানা ৫ বছর চালানোর পর কোম্পানি থেকে একবার ৪২ হাজার টাকা পেয়েছেন। মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি এখন ৯৮ হাজার ১ শত ৫২ টাকা পাবেন। এই টাকার জন্য তিনি বীমা কোম্পানিটি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু কারো কাছ থেকে আশার বাণী শুনতে না পেরে অনেকটা হাতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, বীমার টাকা পেতে এতো ঝামেলা হয়, আগে জানলে কখনোই বীমা করতাম না। তিনি বলেন, বীমা করার আগে কোম্পানির লোক দু’একদিন পর পর বাড়িতে যেয়ে একটি বীমা করার জন্য অনুরোধ জানাতেন। বীমা করলে অনেক সুবিধা পাবার কথা শুনাতেন। কিন্তু পরে সেই বীমা কর্মীর সঙ্গে আর কখনো দেখা হয়নি। এখন মেয়াদ শেষে বীমা দাবির টাকা পেতে কোম্পানির কোন লোকের সহযোগিতা পাই না।
জানা গেছে, শুধু আশরাফুল ইসলাম নয়, প্রাইম ইসলামী লাইফে আশরাফুলের মতো অনেক বীমা গ্রাহক মৃত্যু দাবি ও মেয়াদোত্তর বীমা দাবির টাকা পেতে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কোম্পানিটি বীমা গ্রাহকদের দাবি সময় মতো পরিশোধ করছে না। এমনকি নানা অজুহাতে অনেক গ্রাহকের বীমা দাবী অনিষ্পত্তি রয়ে যাচ্ছে। এই কোম্পানিটিসহ বেশ কিছু বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষে ভূক্তভোগি বীমা গ্রাহকদের জন্য একটি অভিযোগ সেল খোলা হয়েছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ নেয়া হচ্ছে। অভিযোগ যাচাই বছাই করে কিছু ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বীমা আইন – ২০১০ এর আলোকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি বিমা গ্রাহক সুরক্ষা গাইডলাইন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, বিমা গ্রাহকের যে কোনো অভিযোগ ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটিকে। বীমা কোম্পানি তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং এ সংক্রান্ত গৃহীত কার্যক্রম গ্রাহকসহ জনসাধারণের অবগতির জন্য মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করবে। একই সঙ্গে ওয়েবসাইটে বিশেষভাবে প্রদর্শন নিশ্চিত করবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, বীমা পরিকল্প বা পলিসি আইডিআরএ অনুমোদিত হতে হবে। গ্রাহকের কাছে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত পলিসিতে কোনো ব্যত্যয় করা যাবে না। বীমা পলিসির দলিলে বিমাকারীর নাম, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট নম্বর, যোগাযোগের প্রকৃত ঠিকানা, পলিসির নাম, শ্রেণি ও প্রকার ইত্যাদির বর্ণনা এবং কর্তৃপক্ষের নাম ও ঠিকানা থাকতে হবে। গ্রাহককে এমন কোনো ধারণা বা আশ্বাস দেওয়া যাবে না যা বীমা পলিসিতে নেই। গ্রাহকের লিখিত সম্মতি ছাড়া বীমা চুক্তিতে কোনো প্রকার পরিবর্তন করা যাবে না। পলিসি মেয়াদপূর্তি বা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ বা জরিমানা অথবা কোনো বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি থাকলে তা বীমা গ্রাহককে পলিসি বিক্রির আগেই অবহিত করতে হবে।
নতুন নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বীমা পলিসি বিক্রির রসিদ ১৫ দিনের মধ্যে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিমাকারীকে ইস্যু ও সংরক্ষণ করতে হবে এবং সেই রসিদ গ্রাহককে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠাতে হবে। বীমাকারী বা এজেন্ট গ্রাহকদের সব তথ্য সংরক্ষণে উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আদালতের আদেশ বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের আইনানুগ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা যাবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইডিআরএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেছেন, বীমার প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতার বড় কারণ তাঁদের প্রত্যাশা বা বীমা দাবি পরিশোধ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। সব কোম্পানি যে করছে না তা নয়। ১৯টি কোম্পানি ৮০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত বীমা দাবি পরিশোধ করছে। ১০টি কোম্পানি ৭০ শতাংশের ওপর দাবি পরিশোধ করছে। যারা দাবি পরিশোধ করে না, সেই সংখ্যাটা কম। তবে অনেক বেশি মানুষ এ ঘটনায় প্রভাবিত হচ্ছেন। কোম্পানিগুলোতে সুশাসনের অভাবে বীমা দাবি পরিশোধ হচ্ছে না। পুরো বীমা খাতে সুশাসনের অভাব আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বীমা গ্রাহক আশরাফুল ইসলামের করা অভিযোগ সম্পর্কে প্রাইম ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল আলমের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি বর্তমানে ঢাকার বাইরে আছি। ঢাকায় ফিরে আমি বিষয়টি দেখব এবং দাবি সঠিক হলে পরিশোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Posted ১:০৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৯ মে ২০২৪
Arthobiz | zaman zaman


