বৃহস্পতিবার ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দেবে না ইরান

  |   মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   85 বার পঠিত

হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে বাধা দেবে না ইরান

অর্থবিজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার। এর অংশ হিসেবে, সরকারের অনুরোধে ইরান আশ্বস্ত করেছে যে, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের তেলবাহী জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়া হবে না।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন নৌ করিডরটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এতে সম্মতি দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগেই তা ইরানকে জানাতে অনুরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধরত দেশটি। তাই দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা।
সোমবার (১০ মার্চ) সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদীর মধ্যে এক বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হয়েছে বলে জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা টিবিএসকে নিশ্চিত করেন।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রনালী দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাই বাংলাদেশের তেলবাহী জাহাজ ছেড়ে দিতে ইরানকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের আগেই বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজের তথ্য ইরানকে জানাতে বলেছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত।’
এদিকে ২৭,০০০ টন ডিজেল নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই আরও ১,২০,২০৫ টন তেল নিয়ে আরও চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আর এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার চুক্তির বাইরে সরাসরি ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে।

স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তবে বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টন সরবরাহ করছে। এভাবে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আসন্ন পাঁচটি চালানে আসা মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন জ্বালানি দিয়ে প্রায় ১৬ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। সোমবার সকালে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ সাদেক চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জ্বালানিবাহী জাহাজ পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং জানান, সোমবার রাতেও আরও একটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
চীন ও ভারত বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশদুটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ”শুধু ভারত ও চীন নয়। প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্ন দেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ফলে জ্বালানি সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই।”
সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু এবং জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠক শেষে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, জ্বালানি সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশকে জ্বালানি সহায়তা দিতেও আগ্রহী চীন।
বিপিসি এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড-এর মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনের সরবরাহ ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। তবে চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন আমদানির সুযোগ এখনও রয়েছে।
বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য অতিরিক্ত এই সরবরাহ মূলত মার্চের শেষ সপ্তাহ ও এপ্রিল মাসের পুরো চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ মার্চের শুরুতে নির্ধারিত দুটি ডিজেল চালান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছায়নি।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বেশকিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশের কাছে তেল বিক্রির জন্য আমাদের কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠাবে।
বন্দর সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে ‘শিউ চি’ নামের একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে। শিপিং এজেন্টরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও চারটি ডিজেলবাহী ট্যাংকার বন্দরে পৌঁছাবে।
‘লিয়ান হুয়ান হু’ নামের আরেকটি ট্যাংকার প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে সোমবার রাতে বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। ‘এসপিটি থেমিস’ নামের আরেকটি ট্যাংকার বৃহস্পতিবার প্রায় ৩০ হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল নিয়ে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এছাড়া ‘র‌্যাফেলস সামুরাই’ এবং ‘চাং হাং হং তু’ নামের আরও দুটি জাহাজ শনিবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টন করে ডিজেল থাকবে। চারটি ট্যাংকারের স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছাবে। সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে বিকল্প উৎস থেকে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) ব্যবহার করা হবে। জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল আমদানির জন্য উত্তর আমেরিকার কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রোববার জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এপ্রিল মাসে পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সব সম্ভাব্য বিকল্প খতিয়ে দেখছে।
তিনি বলেন “এপর্যন্ত মার্চ মাসে আমাদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায়, সরবরাহ শৃঙ্খলে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) এর মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল সংগ্রহ নিশ্চিত করতে আমরা সব সম্ভাব্য উৎস খতিয়ে দেখছি।”
বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ কবে নিশ্চিত হবে—এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব বলেন, “আমরা যত দ্রুত সম্ভব সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।”
জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা শুরু করেছে।
“সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির একটি অনুমোদন প্রক্রিয়া রয়েছে, যেখানে কমিটির অনুমোদন নিতে হয়। সে কারণেই আমরা আগেভাগেই এই প্রক্রিয়া শুরু করেছি,” বলেন সাইফুল ইসলাম।
বর্তমানে বাংলাদেশ আটটি দেশ থেকে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে, এগুলো হলো— মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ওমান ও কুয়েত।
তবে কর্মকর্তারা জানান, দেশের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের পেট্রোল ও অকটেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ফলে এসব জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে এসেছে।
৭ মার্চ প্রস্তুত করা বিপিসির এক জ্বালানি আমদানি পরিস্থিতি প্রতিবেদনে—যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে—জানানো হয়, মার্চ মাসে ২ লাখ ৯৩ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেলের চালান স্থগিত বা বাতিল হওয়ায় সরবরাহ স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপিত ব্রিফিংয়ে বিপিসি জানায়, নিকটপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। যেমন ভিটল এশিয়া মার্চের জন্য নির্ধারিত একটি অকটেন চালান বাতিল করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে।
৭ মার্চ পর্যন্ত বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। এছাড়া ২৩ হাজার টন অকটেন রয়েছে, যা প্রায় ২৫ দিন চলবে এবং ১৫ হাজার টন পেট্রোল রয়েছে, যা প্রায় ১৫ দিনের জন্য যথেষ্ট। এছাড়া ৬৭ হাজার টন ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে, যা প্রায় ৪৯ দিন চলবে। জেট এু১ এভিয়েশন ফুয়েলের মজুত প্রায় ৬০ হাজার টন, যা প্রায় ৪৯ দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য দেশের সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। এ চিঠি সব জেলা প্রশাসককে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, বাজারে স্বাভাবিকতা বজায় রাখা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে বিপিসি। চলমান বোরো মওসুমে সেচে কৃষকদের জ্বালানি সরবরাহে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১:৩৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

Arthobiz |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191