
| রবিবার, ০৩ আগস্ট ২০২৫ | প্রিন্ট | 315 বার পঠিত

(আপডেট)
অহিদুজ্জামান মিঞা :
পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত বেসরকারি খাতের নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির (বিজিআইসি) বিরুদ্ধে বীমা প্রিমিয়াম আদায়ের ক্ষেত্রে আর্থিক অস্বচ্ছতার তথ্য প্রমান পাওয়া গেছে। কোম্পানিটি বীমা আইন লংঘন করে প্রিমিয়াম আদায়ে প্রচলিত ডিজিটাল মানিরিসিটের পরিবর্তে কোন কোন ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত ম্যানুয়াল মানিরিসিট ব্যবহার করছে। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত কমিশন প্রদান ও বাকিতে ব্যবসা করারও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবসা করায় বীমা কোম্পানিটির আর্থিকভিত দুর্বল হচ্ছে। এতে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারগন সঠিক হারে মুনাফা পাচ্ছে না। সরকারও সঠিক পরিমান রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোম্পানিটির সাম্প্রতিক একটি মটর বীমা ব্যবসায়ে প্রিমিয়াম আদায়ে এই আর্থিক অনিয়মের ঘটনা জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিজিআইসির দিনাজপুর শাখায় অতিসম্প্রতি করা জনৈক সৈয়দ জিকরুল বিন জামির নামের এক গ্রাহকের করা একটি মটর বীমায় অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। এই মটর বীমার প্রিমিয়ামের বিপরিতে গ্রাহককে একটি ম্যানুয়াল মানিরিসিট (নম্বর-৩৩৪, তাং-২৪-০৬-২৫) দেয়া হয়। এতে প্রিমিয়াম দেখানো হয় ৫২ হাজার ৫৩১ টাকা । গ্রাহককে দেয়া বীমা সার্টিফিকেটে উল্লেখিত তথ্যে বীমা কম্পুসেশনে দেখা যায়, বীমাটির বেসিক প্রিমিয়াম ২,৮৭৩ টাকা। এতে বাদ দেয়া বীমা কভারেজ দেখানো হয়েছে চুরি, বণ্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্প। এই কাভারেজগুলো বাদ দেয়ার জন্য ০.৭৫ শতাংশ টাকা কম নেয়া হয়েছে। ট্যারিফ হার দেখানো হয়েছে ১.৯০ শতাংশ। পরবর্তীতে এই একই বীমায় একই তারিখের আর একটি ডিজিটাল মানিরিসিটও পাওয়া যায়। এই মানিরিসিটটির নম্বর ডিজেপি-২০২৫-৩৩৪, তাং-২৪-০৬-২০২৫। এই মানিরিসিটে উল্লেখিত তথ্যের সঙ্গে ম্যানুয়াল পদ্ধতির মানিরিসিটের তথ্যের গড়মিল রয়েছে। এটিতে প্রিমিয়াম দেখানো হয়েছে ৫৯ হাজার ১৯৪ টাকা। এটিতে এনসিবি দেখানো হয়েছে ৫০ শতাংশ। একই অংকের বীমায় প্রিমিয়াম এবং অন্যান্য তথ্য দু’ধরনের কেন, এ বিষয়ে কোন সুনিদিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নি কোম্পানিটির পক্ষ থেকে।
এ বিষয়ে কোম্পানিটির সঙ্গে কথা বলার পর বিজিআইসি’র দিনাজপুরের ব্যাঞ্চ ম্যানেজার রেজাউর রহমান অর্থবিজ অফিসে এই বীমার একটি ডিজিটাল মানিরিসিট পাঠান। এটি পেয়েছি কিনা, ফোন দিয়ে তিনি নিশ্চিত হন। এ সময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, গ্রাহককে ম্যানুয়াল মানিরিসিট দিয়েছিলেন কিনা, তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেন, প্রথমে ম্যানুয়াল মানিরিসিট দেয়া হয়েছিল। তবে তাকে আবার একটি ডিজিটাল মানিরিসিট দেয়া হয়েছে। এ সময় তাকে সার্টিফিকেট কপিটিও পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি সেটি আর পাঠান নাই। ডিজিটাল মানিরিসিট ও আগে করা ম্যানুয়াল মানিরিসিটে দু’রকম তথ্য পাওয়া গেছে। কেন ম্যানুয়াল মানিরিসিট ইস্যু করা হয়েছিল এবং কেনইবা আর একটি ডিজিটাল মানিরিসিট করা হলো, এর কোন সঠিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, গ্রাহক তার ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি টয়োটা গাড়ির (ঢাকা মেট্রো নং-ঘ-১৬-১৯১০) ফার্স্ট পার্টি মটর বীমা করেন। গাড়িটির ড্যামেজ প্রিমিয়াম আসে ৯০ হাজার ৯৩৮ টাকা। ৫০ শতাংশ এনসিবি বাদ দিয়ে প্রকৃত প্রিমিয়াম আসে ৪৫ হাজার ৪৬৯ টাকা। সিটি ব্যাংকের একটি চেকের মাধ্যমে ( চেক নং-৬৭০১৪৯৫ তারিখ ২৪-০৬-২০২৫) প্রিমিয়ামের টাকা পরিশোধ করা হয়। বীমা গ্রাহক সৈয়দ জিকরুল বিন জামিরের সঙ্গে মোবাইলে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি মটর বীমা করার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, সিটি ব্যাংক গুলশান-১ শাখা থেকে ব্যাংক লোন নিয়ে গাড়িটি কেনা হয়। তিনি বিজিআইসির দিনাজপুর শাখায় মটর বীমাটি করেন এবং প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়ে মটর বীমার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন।
এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য জানতে বিজিআইসির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাইফুদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে কোম্পানির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ আব্দুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান রউফের সঙ্ঘে কথা বলতে বলেন। পরে ইমরান রউফের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি অর্থবিজকে বলেন, আইন অনুযায়ি কিউ কোড সংযুক্ত মানিরিসিট দেয়ার বিধান রয়েছে। আমরাও সেটি পরিপালন করে থাকি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্টি প্রিমিয়ামের টাকা পরিশোধ না করেই সার্টিফিকেট চায়। সে ক্ষেত্রে আমরা তাকে ম্যানুয়াল মানিরিসিট দিয়ে থাকি। টাকা পরিশোধ করলে তার প্রয়োজনে কিউ কোড সংযুক্ত মানিরিসিট দেয়া হয়। তার মানে হচ্ছে, আপনারা বাকিতেও ব্যবসা করছেন?, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না ঠিক বাকিতে ব্যবসা নয়, পার্টি টাকা নাও দিতে পারে, এ জন্য টাকা হাতে না পাওয়া পযর্ন্ত কিউ কোড সংযুক্ত মানিরিসিট দেয়া হয় না। কিউ কোড সংযুক্ত মানিরিসিট দিলে বীমাটি কোম্পানির রেজিষ্ট্রিভূক্ত হয় এবং প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানির তহবিলে জমা হয়। এ জন্য টাকা হাতে না পাওয়া পযর্ন্ত এটি দেয়া হয় না।
জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সে প্রিমিয়ামের টাকার ম্যানুয়াল মানিরিসিট নিষিদ্ধ করে ডিজিটিাল মানিরিসিট চালু করা হয়। এই নির্দেশনা লংঘন করা বীমা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ডিজিটাল মানিরিসিটে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র একটি কিউ কোড রয়েছে। এটি স্ক্যান করলে বীমা পত্রটি সম্পর্কে পূণার্ঙ্গ তথ্য পাওয়া যাবে। কিউ কোর্ডে সকল তথ্য সংযুক্ত করার পর ইউনিফাইড ম্যাসেজিং প্লাটফর্ম (ইউএমপি) সার্ভিসের সাথে সংযুক্ত হবে এবং প্রিমিয়ামটি গ্রহন করা সম্পর্কে গ্রাহক ও আইডিআরএ’র সংশ্লিষ্ট শাখা একটি এসএমএস পাবে। প্রিমিয়ামের বিপরিতে সরকার নির্ধারিত কর ও ভ্যাট পাবে। কিন্তু এটি কিউ কোর্ডে সংযুক্ত না হওয়ায় এই এসএমএসটি যাবে না এবং সরকারও কর থেকে বঞ্চিত হবে।
জানা গেছে, নন- লাইফ ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা হরহামেশাই চলছে। আরও কয়েকটি কোম্পানির এ ধরনের ব্যবসার ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। এ ভাবে একদিকে বাকিতে ব্যবসা করা হচ্ছে, যা কোম্পানির রেজিষ্ট্রিভূক্ত হচ্ছে না। অপরদিকে বীমা করার পর পার্টিকে ডিজিটাল মানিরিসিট না দিয়ে ম্যানুয়াল মানিরিসিট দিয়ে বীমা প্রিমিয়ামের পুরো টাকাই আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ অনৈতিক ব্যবসা। এই অনৈতিক ব্যবসায়ে কোম্পানি ও পার্টি উভয়ের সম্মতি থাকে। এতে কোম্পানির কর্মকর্তারা লাভবান হচ্ছেন। এ ধরনের বীমার প্রিমিয়ামের টাকাটা কোম্পানির তহবিলে জমা না দিয়ে নিজেদের পকেট ভরছেন। এ ধরনের ব্যবসা করায় বীমা সেক্টরে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হচ্ছে এবং খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
শুধু বিজিআইসিই নয়, একাধিক নন-লাইফ বীমা কোম্পানি কোন কোন বীমায় ডিজিটাল মানিরিসিট না দিয়ে ম্যানুয়াল মানিরিসিট দিচ্ছে গ্রাহককে। এতে বীমা কোম্পানিটি আর্থিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
এ বিষয়ে আইডিআরএ’র মুখপাত্র ও মিডিয়া কনসালট্যান্ট সামসুন্নাহার সুমি বলেন, নন-লাইফ বীমা ব্যবসায়ে ম্যানুয়াল মানিরিসিট দেয়ার আইনগত কোন সুযোগ নেই। এ ধরনের ব্যবসা কেউ করলে বীমা আইন-২০১০অনুযায়ি আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Posted ৪:০৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ আগস্ট ২০২৫
Arthobiz | zaman zaman


