
| সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | 132 বার পঠিত

অহিদুজ্জামান মিঞা :
নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ নির্দেশনা বাস্তবায়ন এখন অনেকটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নন-লাইফে এজেন্ট কমিশন নিয়ে চলছে ইদুর বেড়াল খেলা। প্রকাশ্যে সবাই এই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানালেও প্রকারান্তরে লুকিয়ে লুকিয়ে অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে অন্যের ব্যবসা বাগিয়ে আনার সেই পুরনো খেলায় আবার অনেকেই মেতে উঠেছেন। এ ধরনের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স নির্দেশনা লংঘন করে অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করছে। তবে এ সব কোম্পানির পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করা হয়েছে।
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান তারেক এ বিষয়ে অর্থবিজকে বলেন, আমি নিজে এবং আমার কোম্পানির চেয়ারম্যান এ এস এম ওয়াহেদুজ্জামান ভিজিলেন্স টিমে আছি এবং এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে ব্যাংকগুলো যাতে আমাদের কাছে কমিশন দাবী না করে, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। তিনি বলেন, আমরাও শুনেছি কোন কোন কোম্পানি গোপনে অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা করছে, যা কাম্য নয়। আমরা আমাদের সকল শাখা ব্যবস্থাপকদের নিয়ে বৈঠক করে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছি। আমরা কখনো শূন্য শতাংশ কমিশন নীতির বাইরে যাব না এবং এই নীতিমালা পুরোপুর কার্যকর করার জন্য আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। তিনি বলেন, শূন্য শতাংশ কমিশন নীতি মেনে চলায় আমারা আমাদের অনেক ব্যবসা হারিয়েছি, তারপরও আমরা এই নীতিতে অটল রয়েছি।
ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের এমডি এস এম শহিদুল্লাহ তার কোম্পানির বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সত্য নয়। আমরা শূন্য কমিশন নীতি মেনে চলছি। তবে কেউ কেউ অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু আমরা করছি না। এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্সের এমডি সাঈদুর রহমান তার কোম্পানির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করার অভিযোগ অস্বীকার করে অর্থবিজকে বলেন, কে বা কারা এ ধরনের অভিযোগ করেছে তা আমার জানা নেই। এই তথ্য সঠিক নয়। তবে এটুকু বলছি আমার কোম্পানির কোন ব্যাঞ্চ ম্যানেজার অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করছে না। বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্সের এমডি নূর-ই-আলমের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি কোন সাড়া দেন নি। এ কারনে তার কোন বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের এমডি মুহম্মদ নূরুল আলম চৌধুরীর মোবাইলে ফোন দিয়ে কোন সাড়া না পাওয়ায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নন-লাইফ বীমা খাতে অতিরিক্ত কমিশন দেয়া বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) এবং বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) দফায় দফায় বৈঠক করে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা সমাধানে উপনিত হয়েছিল। এ জন্য বিআইএ এবং কিছু সংখ্যক নন-লাইফ বীমা কোম্পানির এমডিদের প্রশংসনীয় উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বছর না গড়াতেই কতিপয় বীমা কোম্পানির এমডিদের অসহযোগিতায় এই ভাল উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে বসেছে। তবে বীমা খাতের কোন কোন এমডির অভিমত, এখনো সময় আছে, কে বা কারা এই অনৈতিক কাজে উৎসাহিত করছেন, তাদেরকে সনাক্ত করে যথাযথো ব্যবস্থা নিতে পারলে বীমা খাতটিকে বাচাঁনো যাবে।
জানা গেছে, বিগত সময়ে নন-লাইফ বীমা ব্যবসায়ে ১৫ শতাংশ কমিশন দেয়া স্বীকৃত ছিল। কিন্তু ছোট বাজারে ব্যবসা পেতে অসম প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে কোম্পানিগুলো ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কমিশন দিয়ে ব্যবসা সংগ্রহ করেছে। এতে সাময়িক ভাবে কেউ লাভবান হলেও মূলত বীমা কোম্পাটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। লাভের বড় অংক চলে গেছে অন্যের পকেটে। অর্থাৎ লাভের গুড় পিপড়ায় খেয়েছে। এ কারনে কোম্পানিগুলো নিয়মিত বেতন ভাতা পরিশোধ করতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ করার সিদ্ধন্ত হয়। সংশ্লিষ্ঠ বীমা কোম্পানিগুলো এ সিদ্ধান্ত মেনে চলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে এবং কার্যকরও করে। কিন্তু বেশি সময় এ অবস্থা চলে নাই। চুপি চুপি আবার আগের অবস্থায় অনেকে ফিরে যাচ্ছে। এতে এই খাতে পুনরায় উদ্বেগ উৎকন্ঠা বাড়ছে।
জানা গেছে, নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ নীতিমালা কার্যকর হবার পর বীমা কোম্পানিগুলোতে অনেকটা সচ্চলতা ফিরে আসে। আবার আগের অবস্থানে ফিরে গেলে বীমা কোম্পানিগুলোকে অর্থ সংকটে পড়তে হবে। কিন্তু এ সব জেনে বুঝেও নিয়ম ভেঙ্গে কোন কোন কোম্পানি মুখে স্বীকার না করলেও অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করছে। দু’একটি কোম্পানি এই অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করলেও কোম্পানির এমডি মহোদয় এর দায় নিজ কাঁধে নিতে নারাজ। তিনি এ জন্য কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের দায়ি করে বলছেন, তাদেরকে কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। ব্যবসায়িক টার্গেট পূরন করতে তারা ম্যানেজমেন্টের কথা না শূনে এই অনৈতিক কাজগুলো করছে।
সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের মতিঝিল শাখার ইনচার্জ কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান উজ্জামান অর্থবিজকে বলেন, কিছু কোম্পানি অতিরিক্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করছে, এ কথা ঠিক, তবে এ জন্য ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের শুধু দায়ি করলে চলবে না। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোন ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের একটি টাকাও অতিরিক্ত খরচ করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, শূন্য কমিশন নীতি আমরা মানলে হবে কি, পর্টিতো বুঝে না। কমিশন না দিলে তারা ব্যবসা দিবে না। আমি দিলাম না, অন্য কেউ দিয়ে ব্যবসা নিয়ে নিল। তা হলে আমার লাভ কি হলো। তিনি বলেন, তার কোম্পানি এ বিষয়ে কঠোর। কোন ধরনের বাড়তি কমিশন কাউকে দেয়া যাবে না। আমাদের প্রতি কঠোর নিদের্শ আছে।
এ দিকে নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ বাস্তবায়ন তদারকির জন্য গঠিত ভিজিলেন্স টিম টিম দফায় দফায় বৈঠক করছে করনীয় ঠিক করতে। এই টিমের সর্বশেষ বৈঠক হয় গত ২ মে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অভিযোগ শুনানি করা হয়। বৈঠকে কয়েকটি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ নীতিমালা লংঘন করার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এটি ছিল কমিটির তৃতীয় সভা। সভায় অভিযোগ শুনানি করা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ধরনের অনিয়মে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যায় সে ব্যাপরে পরবর্তী সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। বৈঠকে মোট সাতটি অভিযোগের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভা শেষে জানানো হয়, কমিশন শূন্য শতাংশ বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও নীতিমালা অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে শুনানিতে অংশ নেয়া ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্সের এমডি মোকাররম দোস্তগির অর্থবিজকে বলেন, যে কোন মূল্যে এজেন্ট কমিশন শূন্য শতাংশ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। আমি বৈঠকে কয়েকটি বীমা কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের নাম উল্লেখ করে এই অনিয়মের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী করেছি। তিনি বলেন, এই সেক্টরটিকে রক্ষা করতে হলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। তিনি বলেছেন শুধু ব্রাঞ্চ ম্যানেজাররাই দায়ি নয়, কমিশন দাবী না করার জন্য পার্টিকেও চিঠি দিয়ে সতর্ক করার কথা বলেছি। এখন দেখা যাক পরবর্তী বৈঠকে কি সিদ্ধান্ত হয়। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কমিটির পরবর্তী বৈঠক আগামী ২০ মে ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।

Posted ১:৩৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
Arthobiz | zaman zaman


