বুধবার ২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুঁজিবাজার আইপিও শূন্য দুই বছর

  |   সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   20 বার পঠিত

পুঁজিবাজার আইপিও শূন্য দুই বছর

অর্থবিজ প্রতিবেদক :
দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির আগমন বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) কার্যত তলানিতে ঠেকেছে| টানা দুই বছর ধরে বাজারে কোনো নতুন কোম্পানির আইপিও আসেনি, যা দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে প্রথম| বাজারের প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত ‘নতুন রক্ত’ বা আইপিওর এই দীর্ঘ স্থবিরতাকে দীর্ঘ মেয়াদে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বাজার-বিশ্লেষকরা|

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইপিও কেবল নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যম নয়; এটি বাজারে তারল্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর অন্যতম উপায়| ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানি বাজারে এলে নতুন বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হন| কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আইপিও না থাকায় বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল হচ্ছে|

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুনে টেকনো ড্রাগস সর্বশেষ কোম্পানি হিসেবে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে| এর পর দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আর কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসেনি|

২০২০ ও ২০২১ সালে বাজারে আইপিওর প্রবাহ ছিল উল্লেখযোগ্য| ওই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ মূলধন সংগ্রহ হয়েছিল| ২০২২ সাল থেকে সেই ধারা কমতে শুরু করে এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও সংকুচিত হয়| ২০২৪ সালে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান—এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং টেকনো ড্রাগস পুঁজিবাজার থেকে মোট ৬৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে| এর আগের বছর ২০২৩ সালে তিনটি কোম্পানি ও একটি মিউচুয়াল ফান্ড মিলিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় মাত্র ২০২ কোটি টাকা|

২০২১ সালে ১৫টি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে ১ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল| অথচ পরবর্তী বছরগুলোতে সেই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে| ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ২০টি আইপিও বাজারে এসেছিল| এমনকি ২০০৯-২০১০ সালের অস্থির বাজারেও আইপিও কার্যক্রম ছিল উল্লেখযোগ্য| সেই তুলনায় বর্তমানের দীর্ঘ আইপিও-শূন্যতাকে অ¯^াভাবিক বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা|

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি কমিশন আইপিও নীতিমালাসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নতুন আইপিও আনার বিষয়টি প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি| আইপিও প্রক্রিয়া সচল রাখতে একটি মধ্যপন্থা অবল¤^নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি|’

তিনি বলেন, ‘এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা| কারণ নতুন আইপিও না থাকলে বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ ও গভীরতা- দুটিই কমে যায়| আইপিও ছাড়া কার্যকর পুঁজিবাজার কল্পনা করা যায় না|

তবে বর্তমান কমিশনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘নতুন কমিশন আইপিও কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্ব দিচ্ছে| ফলে শিগগিরই বাজারে নতুন কোম্পানির আগমন শুরু হবে|’

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘টানা দুই বছর ধরে পুঁজিবাজারে কোনো নতুন আইপিও আসেনি| এর আগের দুই বছরেও হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে| ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংকট আরও প্রকট হয়েছে|’

তিনি বলেন, ‘আইপিওর প্রবাহ বন্ধ থাকলে বাজারের গভীরতা ও পরিধি- দুটিই কমে যায়| নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে বাজারের আকারও বাড়ে না| তাই পুঁজিবাজার সম্প্রসারণে নতুন কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনার বিকল্প নেই|’

সাইফুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘নতুন কমিশন শিগগিরই আরও বেশি কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে|’

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, ‘অতীতে আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার চাপ তুলনামূলক কম ছিল| তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না হলে আইপিওর অনুমোদন মিলবে না- এমন ধারণা ˆতরি হয়েছিল| পাশাপাশি ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতেও পর্যাপ্ত প্রণোদনা ছিল না|’

তিনি বলেন, ‘ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে এরই মধ্যে আইপিও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে| আন্তর্জাতিক সিকিউরিটিজ ভ্যালুয়েশন স্ট্যান্ডার্ডস অন্তর্ভুক্ত করায় আইপিও প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়েছে| বর্তমান কমিশন বেস্ট প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে মানসম্পন্ন কোম্পানি বাজারে আনতে কাজ করছে| এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য আড়াই শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধাও এবার যুক্ত হয়েছে| পাশাপাশি ইস্যুয়ার কোম্পানি, বিএপিএলসি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনও ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে গুরুত্ব দিচ্ছেন| তাই আশা করা যাচ্ছে শিগগিরই আইপিও খরা কেটে যাবে|’

সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) আয়োজিত ‘নতুন আইপিও: প্রস্তুতি, চ্যালেঞ্জ ও তালিকাভুক্তির রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারেও নতুন কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার ওপর জোর দেন অংশীজন| এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজার মধ্যস্থতাকারী, শিল্প খাত এবং সম্ভাব্য ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন|

সেমিনারে বিএপিএলসি জানায়, দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ত্বরাšি^ত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার বিকল্প নেই|

 

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৫৭ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

Arthobiz |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement
সম্পাদক : অহিদুজ্জামান মিঞা
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান ম্যানশন, ৮-ই, ২৮/এ-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ইমেইল: arthobiz61@gmail.com
যোগাযোগ: 01670045191